সর্বশেষ

সাহস, দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রচিন্তার এক অনন্য অধ্যায়: শহীদ জিয়াকে নিয়ে ড. সুকোমল বড়ুয়ার মূল্যায়ন

স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ, বৌদ্ধতাত্ত্বিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাদের অবদান সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম। তাঁর নেতৃত্ব, রাষ্ট্রচিন্তা, কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার নানা দিক তুলে ধরেছেন স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ।


ড. বড়ুয়ার মতে, জিয়াউর রহমানকে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার সময়কালকে বিবেচনায় নিলেই চলবে না। তাঁর সাহস, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধের দিকগুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।


মুক্তিযুদ্ধে সাহসী নেতৃত্ব
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ড. বড়ুয়া বলেন, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ভয়াবহ দমন-পীড়নের মুখে জিয়াউর রহমান যে সাহসিকতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি প্রশ্ন রাখেন, সেই সময়ে অনেক জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও কেন জিয়াউর রহমানই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছিলেন? তাঁর মতে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে জিয়ার অসাধারণ নেতৃত্বগুণ ও মানসিক শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।


প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জাতীয় নেতৃত্বে
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি ইউনিয়নে শহীদ জিয়ার জন্মভিটা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ড. বড়ুয়া বলেন, একটি প্রত্যন্ত গ্রামের সন্তান হয়ে জাতীয় নেতৃত্বের শীর্ষে পৌঁছানো সহজ বিষয় নয়। এর পেছনে ছিল তাঁর অসাধারণ আত্মবিশ্বাস, দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলি।


পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন দিগন্ত
ড. বড়ুয়ার ভাষায়, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। তিনি এমন এক সময়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন, যখন অনেকেই দেশটির ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করতে পারেননি। পাশাপাশি জাপান, থাইল্যান্ডসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার অংশ ছিল বলে উল্লেখ করেন এই শিক্ষাবিদ।


বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন
ড. বড়ুয়ার মতে, জিয়াউর রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা প্রতিষ্ঠা। তিনি এমন একটি জাতীয় পরিচয়ের কথা বলেন, যা দেশের সব জাতিগোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়কে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় সংহতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
উন্নয়ন ও জনকল্যাণের রাষ্ট্রদর্শন
স্বল্প সময়ের শাসনামলেও দেশের অর্থনীতি, কৃষি, নারী উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে জিয়াউর রহমানের নানা উদ্যোগের কথা স্মরণ করেন ড. বড়ুয়া। তাঁর মতে, খাল খনন কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, পোশাক শিল্পের বিকাশ এবং নারী ও শিশু উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দেশের উন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে সহায়তা করেছে।


সাধারণ মানুষের নেতা
রাষ্ট্রপতি হয়েও সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল জিয়াউর রহমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ড. বড়ুয়া স্মরণ করেন, খাল খনন কর্মসূচিতে সাধারণ পোশাকে কাদামাটির মধ্যে নেমে কাজ করতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এমন দৃশ্য মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও প্রেরণা সৃষ্টি করেছিল।


সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষক
সামরিক পেশায় দীর্ঘ সময় কাটালেও শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি জিয়াউর রহমানের আগ্রহ ছিল গভীর। স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মাননার প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি দেশের জ্ঞানী-গুণীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।


ইতিহাসের আলোয় মূল্যায়ন
ড. সুকোমল বড়ুয়ার মতে, শহীদ জিয়াউর রহমানকে বুঝতে হলে তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা, রাষ্ট্রদর্শন, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয়তাবাদী চিন্তা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাঁর ভাষায়, “শহীদ জিয়াকে বুঝতে হলে অনেক বিষয়ের গভীরে যেতে হবে; শুধু উপরের দৃশ্য দেখে তাঁর অবদান অনুধাবন করা সম্ভব নয়।”

© 2026 Harkara24.com। এই ওয়েবসাইটের সকল কনটেন্ট সংরক্ষিত। বাইরের কোনো ওয়েবসাইটের তথ্য বা কনটেন্টের জন্য Harkara24 দায়বদ্ধ নয়।

FixiFite Web Solutions