ঈদুল আজহার উৎসবের আমেজ কাটতে না কাটতেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

ঈদ পুনর্মিলনী, গণসংবর্ধনা ও দলীয় কর্মসূচিগুলোতে সৌজন্যমূলক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরিবর্তে প্রাধান্য পেয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, অভিযোগ-প্রতিআরোপ এবং রাজনৈতিক সমালোচনা। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে নতুন করে সরব হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ।

রাজনৈতিক ‘চক্রান্ত’ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। শুক্রবার নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা ইতিবাচক হলেও রাজনৈতিক চক্রান্ত বা তার ইঙ্গিত জনগণ কখনো ভালোভাবে নেয়নি এবং ভবিষ্যতেও নেবে না।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের একটি বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। রোববার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে এক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি নিজেকে মন্ত্রীদের চেয়েও প্রভাবশালী দাবি করেন।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে মন্ত্রীরা মাসে একবার কথা বললেও তিনি প্রতিদিন কয়েকবার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান। বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা, সরকারি প্রটোকল এবং গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ঘিরে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মঙ্গলবার রাজধানীতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর সদস্য ছিলেন না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগও নাকচ করেন তিনি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়েছে এনসিপির বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগও। সাবেক গণঅধিকার পরিষদ নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এনসিপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নিয়োগে প্রভাব খাটানো এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলেন। এসব অভিযোগ রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে ঝিনাইদহে হামলার ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি। দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী অভিযোগ করেন, ছাত্রদল-যুবদলের পাশাপাশি পুলিশও তাদের ওপর হামলায় জড়িত ছিল। তিনি এ পরিস্থিতিকে অতীতের ‘পুলিশ লীগ’ সংস্কৃতির নতুন রূপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

স্বাস্থ্য খাত নিয়েও রাজনৈতিক বক্তব্য এসেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন কিশোরগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে বলেন, গত ১৭ বছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। তিনি হামের সংক্রমণ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
অন্যদিকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সামাজিক অবক্ষয় ও মৌলবাদ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঝিনাইদহে এক ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মহল ধর্মকে ব্যবহার করে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। যুবসমাজকে মাদক ও উগ্রবাদ থেকে দূরে রাখতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রসঙ্গেও এসেছে কড়া বক্তব্য। চট্টগ্রামে এক দোয়া মাহফিলে বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, বিএনপির একজন কর্মী বেঁচে থাকা পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে দেশে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল মাদকবিরোধী অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাদকের বিস্তার ঘটেছে এবং অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের পরপরই বিভিন্ন দলের নেতাদের এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ ও মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্বাচন, সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য যত বাড়বে, ততই রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
