সর্বশেষ

সরকারের মোট ব্যয়ের ৮৪ শতাংশ পরিচালন খাতে, শেষ প্রান্তিকে ব্যয়ের চাপ ৩.৮১ লাখ কোটি টাকা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকায়। এর মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে পরিচালন খাতে, যা মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, ভর্তুকি এবং ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যবহৃত হয়েছে।

অর্থ বিভাগের বাজেট বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত প্রান্তিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে প্রথম নয় মাসে বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ৫২ শতাংশ। ফলে অর্থবছরের বাকি তিন মাসে সরকারের সামনে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বড় চাপ তৈরি হয়েছে।

পরিচালন ব্যয়েই সিংহভাগ অর্থ

প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৮১০ কোটি টাকা ছিল চলতি ব্যয়, যা পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৯২ শতাংশ।

এ সময় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৯৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ২৯ শতাংশ। অন্যদিকে মূলধনি ব্যয়, অর্থাৎ অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ খাতে ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা।

রাজস্ব ঘাটতি, বাড়ছে ঋণনির্ভরতা

পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে ব্যাপকভাবে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

প্রথম নয় মাসে রাজস্ব ও অনুদান মিলিয়ে সরকারের মোট আয় হয়েছে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা। একই সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা কম।

ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে সরকার নিট ১ লাখ ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। তবে ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ২০ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের মোট নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ২১৮ কোটি টাকা।

অন্যদিকে বিদেশি উৎস থেকে নিট ঋণ ছিল ঋণাত্মক ৯ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা।

উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতি

উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের গতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর। প্রথম নয় মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৫৭ হাজার ৫৪ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২৩ শতাংশ।

এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৫৫ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, শেষ সময়ে বরাদ্দ ছাড় এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার কারণে এডিপির অগ্রগতি ধীর হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের ধীরগতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা। তার মতে, শুধু অর্থ ব্যয় করাই নয়, বরং সেই ব্যয়ের গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগামী বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক সিএজি মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীও বাজেট বাস্তবায়নের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের অবস্থান

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এডিপি ও সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোকে নির্ধারিত সময় ও ব্যয়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং সীমাবদ্ধতা দূর করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে শিগগিরই একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব চলতি অর্থবছরের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। ফলে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে বাজেট বাস্তবায়ন ও ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

© 2026 Harkara24.com। এই ওয়েবসাইটের সকল কনটেন্ট সংরক্ষিত। বাইরের কোনো ওয়েবসাইটের তথ্য বা কনটেন্টের জন্য Harkara24 দায়বদ্ধ নয়।

FixiFite Web Solutions